প্রবাসীদের ঈদ নিয়ে কিছু কথা | দূরে থেকেও ঈদ উদযাপন করুন।

 

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই মিলন। কিন্তু যে মানুষটি হাজার মাইল দূরে বিদেশের কোনো শহরে বসে রাতের আঁধারে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাঁর কাছে ঈদ অন্য রকম এক অনুভূতির নাম। প্রবাসীদের ঈদ নিয়ে কিছু কথা বলতে গেলে শুধু উৎসবের রং নয়, তার সঙ্গে মিশে থাকা নীরব চোখের জলের কথাও বলতে হয়।

দেশে থাকতে বুঝিনি ঈদ কতটা আপন  প্রবাসে এসে বুঝলাম, ঈদ আসলে ঘরের গন্ধ, মায়ের হাতের রান্না আর আজানের সুরের আরেক নাম।

প্রবাসী জীবনে ঈদের আলাদা একটি অর্থ।

বাংলাদেশ থেকে শুরু করে ভারত, পাকিস্তান কিংবা মিয়ানমার  দক্ষিণ এশিয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা পূর্ব এশিয়ার নানা দেশে কর্মসূত্রে প্রবাস জীবন কাটান। তাঁদের জীবনে ঈদ আসে অন্যভাবে। দেশে যেখানে রমজান মাস থেকেই উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়, সেখানে প্রবাসে সেই আমেজ অনেকটাই ম্লান। প্রবাসীদের ঈদ নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয় যে, তাঁদের জন্য ঈদের দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয় এটি একটি আবেগের বিস্ফোরণ।

কাজের ব্যস্ততায়, কখনো বা শিফটের কারণে অনেক প্রবাসী ঈদের নামাজটুকুও ঠিকঠাক পড়তে পারেন না। যিনি পারেন, তিনি ঈদগাহ বা মসজিদ থেকে ফিরে একাকী ঘরে বসে থাকেন। সেমাইয়ের গন্ধ নেই, নতুন জামার উত্তেজনা নেই, ছোট ভাই বা বোনের আনাগোনা নেই  শুধু আছে ফোনের স্ক্রিনে পরিচিত মুখগুলো।

ঈদের সকালে প্রবাসীর মন।

ঈদের চাঁদ দেখার মুহূর্তটি প্রবাসীদের কাছে বেদনাদায়ক এক অভিজ্ঞতা। দেশে থাকলে হয়তো ছাদে উঠে সবাই মিলে চাঁদ খুঁজতেন, কিন্তু প্রবাসে সেই সুযোগ নেই। ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে দেখা যায় দেশের মানুষ চাঁদের ছবি পাঠাচ্ছে, আনন্দ করছে  আর প্রবাসী তখন হয়তো রাত তিনটার শিফট শেষ করে ঘরে ফিরছেন।

আরো পড়ুন :২০২৬ সালের কুরবানির ঈদ কত তারিখ অনেকেই ভুল জানেন এই তারিখটি।

ঈদের সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম যে কাজটি একজন প্রবাসী করেন, তা হলো বাড়িতে ফোন দেওয়া। মায়ের কণ্ঠস্বর শুনলে মনের ভেতর যে অনুভূতি তৈরি হয়  তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। প্রবাসীদের ঈদ নিয়ে কিছু কথা বলতে গেলে এই টেলিফোন বা ভিডিও কলের দৃশ্যটির কথা সবার আগে আসে।

সৌদি আরবে কর্মরত প্রায় ৩০-৩৫ লাখ বাংলাদেশির মধ্যে অধিকাংশই ঈদের সময় দেশে ফিরতে পারেন না। ইউরোপ বা আমেরিকায় অনেকে ছুটি পান না, কারণ সেখানে ঈদ সরকারি ছুটি নয়।

প্রবাসে ঈদের আয়োজন কেমন হয়?

তবে প্রবাসীরাও নিজেদের মতো করে ঈদ উদযাপন করেন। বিশেষত যেসব দেশে বাংলাদেশি বা দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটি বড়, সেখানে ঈদের আলাদা একটি উৎসব তৈরি হয়। নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস থেকে লন্ডনের ব্রিকলেন, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে দুবাইয়ের দেরা এসব জায়গায় ঈদের দিনে হাজার হাজার বাংলাদেশি একসঙ্গে নামাজ পড়েন, কোলাকুলি করেন এবং দেশীয় খাবারের আয়োজন করেন।

দেশ প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা (আনুমানিক) ঈদ উদযাপনের বিশেষত্ব
সৌদি আরব ৩০ লক্ষ+ মসজিদে বড় জামাত, কমিউনিটি ভোজ
সংযুক্ত আরব আমিরাত ১০ লক্ষ+ বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় ঈদ মিলনমেলা
যুক্তরাজ্য ৬-৭ লক্ষ ব্রিকলেন ও মসজিদকেন্দ্রিক উৎসব
মালয়েশিয়া ৭-৮ লক্ষ সরকারি ছুটিতে বাঙালি পাড়ায় উৎসব
যুক্তরাষ্ট্র ৫-৬ লক্ষ কমিউনিটি সেন্টারে ঈদ মেলা, কালচারাল শো
ইতালি/গ্রিস ১-২ লক্ষ ছোট পরিসরে ঘরোয়া আয়োজন

পরিবার থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণা।

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার শীর্ষে থাকে উৎসবের সময়গুলোতে পরিবার থেকে বিচ্ছেদের বেদনা। ঈদ বা পূজার সময় ঘরে ফিরতে না পারার কষ্ট অনেক প্রবাসীকে গভীর একাকীত্বে ফেলে দেয়। প্রবাসীদের ঈদ নিয়ে কিছু কথা আলোচনা করলে এই মানসিক চাপের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

বাবার অসুস্থতার কথা জেনেও ছুটতে পারেন না অনেকে। সন্তানের প্রথম ঈদের কথা দেশে শুনে কান্না চাপেন পিতা। বৃদ্ধ মায়ের হাতের সেমাই খাওয়ার স্বপ্ন দেখেন প্রতিবছর  কিন্তু বছরের পর বছর সেই ইচ্ছাপূরণ হয় না। এই যন্ত্রণার কোনো ভাষা হয় না, শুধু হয় অনুভব।

ডিজিটাল যুগে প্রবাসীর ঈদ।

প্রযুক্তির অগ্রগতি অন্তত একটি জায়গায় প্রবাসীদের জীবনকে একটু সহজ করে দিয়েছে। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন ভিডিও কলে মুখ দেখা যায়, একসঙ্গে খাবার খাওয়ার ভান করা যায়। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শুভেচ্ছা পাঠানো, ফেসবুক লাইভে পরিবারের সঙ্গে থাকার চেষ্টা  এই ছোট ছোট উদ্যোগই এখন প্রবাসীর ঈদ উদযাপনের একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে।

এমনকি অনেক পরিবার এখন ঈদের সকালে একসঙ্গে ভার্চুয়ালি নাস্তা করেন। প্রবাসী বাবা দূরে বসে দেখেন সন্তান নতুন জামা পরে ছবি তুলছে, মা কাঁদো কাঁদো মুখে হাসার চেষ্টা করছেন। এই দৃশ্যই এখন লক্ষ লক্ষ প্রবাসী পরিবারের ঈদের বাস্তবতা।

প্রযুক্তি দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু মায়ের গলা জড়িয়ে ধরার সেই উষ্ণতা  তা কোনো স্ক্রিন দিতে পারে না।

প্রবাসীরা যেভাবে দেশকে ভালোবাসেন।

প্রবাসীদের ঈদ নিয়ে কিছু কথা বললে একটি দিক আলাদাভাবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে  তা হলো তাঁদের দেশপ্রেম। বিদেশে বসেও তাঁরা দেশের নাড়ির টান অনুভব করেন। ঈদের আগে বেতন পেলে প্রথমেই দেশে টাকা পাঠান। পরিবারের জন্য কাপড়, শিশুদের জন্য উপহার  এই আনন্দটুকু তাঁদের কাছে নিজে ঈদ উদযাপন করার চেয়ে কম নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের মাসগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই প্রবাসীরাই দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড  আর তাঁরা নিজেরা ঈদে শুধু একটু স্মৃতি, একটু মায়া আর পরিচিত মুখের ছায়া চান।

ঈদ কেনাকাটা ও প্রবাসীর আত্মপরিচয়।

বিদেশে থেকেও প্রবাসীরা তাঁদের পরিচয় ধরে রাখেন ঈদের মাধ্যমে। বাংলাদেশি দোকান থেকে শাড়ি বা পাঞ্জাবি কেনা, হালাল মাংস সংগ্রহ করে বাড়িতে রান্না করা, পাড়ার মসজিদে ঈদের জামাতে অংশ নেওয়া  এই অভ্যাসগুলো তাঁদের শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে।

অনেক প্রবাসী পরিবার নিজেদের ঘরে ছোট করে হলেও ঈদের আয়োজন করেন। ঘর সাজানো, সেমাই-পায়েস রান্না করা, সন্তানদের নতুন পোশাক পরানো  এই ছোট আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্মে বাংলাদেশের সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখছেন।

প্রশ্নোত্তর

প্রবাসীরা কি ঈদের দিন ছুটি পান?

এটা নির্ভর করে কোন দেশে আছেন তার উপর। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে ঈদে সরকারি ছুটি থাকলেও ইউরোপ বা আমেরিকায় ঈদ সরকারি ছুটি নয়, তাই অনেক প্রবাসীকে কাজের মাঝে ঈদ উদযাপন করতে হয়।

প্রবাসে ঈদের নামাজ কোথায় পড়া হয়?

প্রবাসে স্থানীয় মসজিদ বা কমিউনিটি হলে ঈদের নামাজ আদায় করা হয়। বড় শহরগুলোতে বাংলাদেশি বা মুসলিম কমিউনিটির নিজস্ব মসজিদ এবং ঈদগাহ রয়েছে।

ঈদে প্রবাসীরা কীভাবে পরিবারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকেন?

হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক মেসেঞ্জার ও ইমো-র মাধ্যমে ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। অনেকে ভার্চুয়ালি একসঙ্গে সকালের নাস্তা বা দুপুরের খাবার উপভোগ করেন।

প্রবাসীরা ঈদে কতটা রেমিট্যান্স পাঠান?

ঈদের আগের মাস বা দুই মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ সাধারণত ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। পরিবারকে ঈদ কেনাকাটার জন্য বাড়তি অর্থ পাঠানোই এর প্রধান কারণ।

বিদেশে কি বাংলাদেশি খাবার পাওয়া যায় ঈদের সময়?

হ্যাঁ, বড় শহরগুলোতে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ ও মুদির দোকানে সেমাই, পোলাও, কোরমা সহ ঈদের বিশেষ খাবারের উপকরণ পাওয়া যায়।

প্রবাসীরা মানসিকভাবে ঈদের একাকীত্ব কীভাবে কাটান?

কমিউনিটি জমায়েত, বন্ধুদের সঙ্গে একসাথে খাওয়াদাওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে সময় কাটানোই সবচেয়ে সাধারণ উপায়। অনেকে স্বেচ্ছাসেবী কাজে নিজেকে যুক্ত রাখেন।

কোন দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় ঈদ উদযাপন হয়?

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বড় ঈদ আয়োজন হয়। লন্ডনের ব্রিকলেন এলাকায় হাজার হাজার বাংলাদেশি মিলে ঈদ উদযাপন করেন।

প্রবাসী শিশুরা কীভাবে ঈদ উপলব্ধি করে?

প্রবাসে জন্মগ্রহণ করা বা বড় হওয়া শিশুদের কাছে ঈদ মানে নতুন পোশাক, মসজিদে যাওয়া এবং বাড়িতে বিশেষ খাবার। অনেকে বাবা-মায়ের কাছ থেকে বাংলাদেশের ঈদের গল্প শুনে দেশের প্রতি আগ্রহ তৈরি করেন।

ঈদে প্রবাসীরা দেশে ফিরতে পারেন না কেন?

ভিসা জটিলতা, বিমান টিকিটের উচ্চ মূল্য, কাজের ছুটি না মেলা এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা  এই কারণগুলো প্রবাসীদের ঈদে দেশে আসতে বাধা দেয়।

প্রবাসীদের ঈদ কি দেশের ঈদ থেকে আলাদা?

হ্যাঁ, অনেকটাই আলাদা। দেশে ঈদ মানে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, আনন্দ আর উৎসব। প্রবাসে ঈদ মানে স্মৃতি, ভিডিও কল, ছোট পরিসরের আয়োজন এবং অনেকটা নীরব আবেগের মিশ্রণ।

শেষ কথা

প্রবাসীদের ঈদ নিয়ে কিছু কথা বলার পর মনে হয়  এই মানুষগুলো শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য বিদেশে যাননি, তাঁরা পরিবারের স্বপ্ন বুকে নিয়ে নিজেদের সুখ বিসর্জন দিয়েছেন। প্রতিটি ঈদে তাঁরা হাসেন  কিন্তু সেই হাসির পেছনে যে কষ্টের গল্প লুকিয়ে থাকে, তা অনেকেরই অজানা।

তাই যাঁরা দেশে আছেন, তাঁরা এই ঈদে একবার মনে করুন সেই প্রিয় মানুষটির কথা যিনি হাজার মাইল দূরে একা বসে আপনার জন্য, পরিবারের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। একটা ফোন, একটা মেসেজ, একটু ভালোবাসা এটুকুই তাঁর ঈদকে অর্থবহ করে তুলতে পারে।

ঈদ মোবারক — দেশে থাকুন বা প্রবাসে, ঈদের আনন্দ যেন সবার কাছে পৌঁছায়।

👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔

📌 পোস্টটি শেয়ার করুন! 🔥

 

1 thought on “প্রবাসীদের ঈদ নিয়ে কিছু কথা | দূরে থেকেও ঈদ উদযাপন করুন।”

Leave a Comment