এই প্রশ্নের উত্তর একটা নয়, অনেকগুলো। আর সেই উত্তরগুলো শুধু ফুটবলের মধ্যে নেই সেগুলো লুকিয়ে আছে আমাদের সংস্কৃতি, আবেগ, সামাজিক মনস্তত্ত্ব আর একটা কিংবদন্তির নামে। চলুন, জেনে নেওয়া যাক সেই পুরো গল্পটা।

ম্যারাডোনা যেখান থেকে শুরু হয়েছিল সব।

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থনের বীজ বোনা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে, মেক্সিকো বিশ্বকাপে। দিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা তখন ফুটবলের ঈশ্বর। “হ্যান্ড অফ গড” গোল আর ৬০ মিটার একক ড্রিবলিংয়ের সেই অবিশ্বাস্য গোল এই দুটো মুহূর্ত সারা পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিল।

আরো পড়ুন : রোনালদো ২০২৬ বিশ্বকাপ কি জিততে পারবেন?

বাংলাদেশেও টেলিভিশনের পর্দায় সেই ম্যারাডোনাকে দেখে কোটি মানুষ মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। একজন দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলে, যিনি নিজের প্রতিভা আর পরিশ্রম দিয়ে সারা বিশ্বকে জয় করলেন এই গল্পটা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সাথে দারুণভাবে মিলে গিয়েছিল। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই তখন দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হচ্ছিলেন, স্বপ্ন দেখছিলেন একটু ভালো থাকার। ম্যারাডোনার জীবন যেন সেই স্বপ্নেরই প্রতিফলন।

💡 জানেন কি?

ম্যারাডোনা নিজেই বলেছিলেন, ভারত উপমহাদেশে তাঁর সবচেয়ে বেশি ভক্ত। বাংলাদেশেও তাঁর জনপ্রিয়তা কোনো অংশে কম ছিল না বরং অনেক জায়গায় দেশীয় নায়ককে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

গরিবের চ্যাম্পিয়ন ম্যারাডোনার আবেদন।

ম্যারাডোনা শুধু ভালো ফুটবলার ছিলেন না তিনি ছিলেন একজন বিদ্রোহী। ধনী ও ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে তাঁর সরব অবস্থান, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এই দিকগুলো তাঁকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে আরও প্রিয় করে তুলেছিল। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে তিনি যখন মাঠে নামতেন, বাংলাদেশের কোটি মানুষ তাঁর সাথে মাঠে নামতেন মনে মনে।

মেসি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে আবেগের সেতু।

ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনার সমর্থন যদি কিছুটা কমার সম্ভাবনাও থাকত, লিওনেল মেসি সেই সুযোগ দেননি। বার্সেলোনায় মেসির উত্থান, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হওয়া, বারবার বিশ্বকাপের কাছে গিয়ে ফিরে আসা প্রতিটি মুহূর্তে বাংলাদেশ তাঁর সাথে ছিল।


ব্যালন ডি’অর জিতেছেন মেসি
২০২২
বিশ্বকাপ জয়ের বছর
কোটি+
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার ভক্ত

Messi Bangladesh  এই দুটো শব্দ একসাথে বললে যে ছবি চোখে আসে, তা অনেকটাই অবিশ্বাস্য। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে যখন আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলো, বাংলাদেশের রাস্তায় যে আনন্দ মিছিল বেরিয়েছিল, তা যেকোনো নিরপেক্ষ দর্শককে অবাক করে দিয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট সর্বত্র নাচ-গান-উৎসব। মনে হচ্ছিল যেন বাংলাদেশ নিজেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে!

আরো পড়ুন : এটা কি মেসির শেষ বিশ্বকাপ? World Cup 2026
“মেসি যখন কাঁদছিলেন, তখন বাংলাদেশেও লাখো মানুষ কেঁদেছেন। এই সম্পর্কটা শুধু ফুটবলের নয়, এটা আবেগের, ভালোবাসার।”

মেসির সংগ্রাম বাংলাদেশের মানুষের নিজের গল্প।

মেসির ক্যারিয়ার কিন্তু মসৃণ ছিল না। বারবার বিশ্বকাপ ফাইনালে হার, দলের হয়ে অনেকবার সমালোচিত হওয়া, কিন্তু তবু হার না মানা — এই দৃঢ়তাটা বাংলাদেশের মানুষের কাছে অনেক পরিচিত অনুভূতি। জীবনের প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার যে সংগ্রাম, সেটা মেসির গল্পে খুঁজে পান অনেকে।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণ।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা সমর্থন।

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা সমর্থক হওয়াটা অনেকটা পারিবারিক ঐতিহ্যের মতো হয়ে গেছে। বাবা আর্জেন্টিনার ভক্ত ছিলেন, তাই ছেলেও হবেন এই চলটা বাংলাদেশে খুব সাধারণ। একটা পরিবারে একজন আর্জেন্টিনার সমর্থক থাকলে, পরিবারের বাকিরাও ধীরে ধীরে সেই দলের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েন।

আরো পড়ুন : আর্জেন্টিনা না ব্রাজিল ২০২৬ বিশ্বকাপে কার দল বেশি শক্তিশালী?

এই ব্যাপারটাকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন “সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব” (Social Identity Theory)। মানুষ এমন দলকে সাপোর্ট করতে পছন্দ করে যে দলের সাথে তার আশেপাশের মানুষ সংযুক্ত। যখন পুরো পাড়া আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করে, তখন নতুন প্রজন্মও স্বাভাবিকভাবেই সেই দলের সাথে যুক্ত হয়।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মেরুকরণ।

বাংলাদেশে মূলত দুটো শিবির আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল। এই দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাংলাদেশেও এসে পৌঁছেছে। মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশে যখন কেউ একটা দল বেছে নেন, তখন তিনি শুধু দলটাকে সাপোর্ট করেন না বরং তার বিরোধী দলকে (মানে আর্জেন্টিনার সমর্থক ব্রাজিলকে) “হারতে দেখতে” চান। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মনোভাব সমর্থনকে আরও তীব্র করে তোলে।

  • বিশ্বকাপে ব্রাজিল হারলে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা বাড়তি আনন্দ পান
  • আর্জেন্টিনা জিতলে ব্রাজিলের সমর্থকরা নীরব হয়ে যান
  • এই প্রতিযোগিতা পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যেও চলে
  • ম্যাচের দিন বাজি ধরা, রান্না করা, একসাথে দেখা এসব সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়েছে

মিডিয়া ও প্রযুক্তির ভূমিকা।

১৯৮০-৯০-এর দশকে বাংলাদেশে টেলিভিশনের প্রসার ঘটে। সেই সময়ে বিটিভিতে বিশ্বকাপের ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার শুরু হয়। প্রথমবার যখন বাংলাদেশের মানুষ টিভিতে আর্জেন্টিনার খেলা দেখলেন, তখন ম্যারাডোনার জাদুতে তারা মুগ্ধ হয়ে গেলেন। এরপর থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন আরও বাড়তে থাকে।

আরো পড়ুন : বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হতে মাত্র কয়েকদিন বাকি এখনও জানেন না এই তথ্যগুলো?

পরবর্তী সময়ে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া এই সমর্থনকে আরও শক্তিশালী করেছে। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে মেসির হাইলাইট ভিডিও, আর্জেন্টিনার জার্সি পরা সেলফি, বিশ্বকাপ ফাইনালের লাইভ স্ট্রিম এসব মিলিয়ে Argentina support in Bangladesh এখন এক বিশাল ডিজিটাল আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থন শুধু ফুটবলের সমর্থন নয় এটা একটা পরিচয়, একটা আবেগ, একটা সংস্কৃতি।
অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক।

আন্ডারডগের প্রতি ভালোবাসা

বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই আন্ডারডগের প্রতি সহানুভূতিশীল। আমাদের নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও তো তাই একটা ছোট দেশ বড় শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হয়েছে। এই মনোভাবটা আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থনেও কাজ করে। যখন আর্জেন্টিনা কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে, তখন বাংলাদেশ তাদের আরও বেশি সমর্থন দিয়েছে।

জার্সি ও মার্চেন্ডাইজিং শিল্প।

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার জার্সির বিক্রি বিশ্বকাপের সময় বহুগুণ বেড়ে যায়। ঢাকার নিউমার্কেট থেকে শুরু করে জেলার ছোট বাজার সর্বত্র নীল-সাদা জার্সি। এই ব্যবসাটা নিজেই একটা সামাজিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আর্জেন্টিনার জার্সি পরা মানে শুধু একটা দলকে সাপোর্ট করা নয় এটা একটা পরিচয় প্রকাশের উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২২ বিশ্বকাপ বাংলাদেশের উৎসব।

কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ ছিল বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা ফ্যানদের জন্য সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত। ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনা যখন বিশ্বকাপ জিতল, বাংলাদেশের রাস্তায় যে দৃশ্য তৈরি হলো, তা আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও ঠাঁই পেল। বিবিসি, আল জাজিরা-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের উৎসবের ছবি-ভিডিও প্রকাশ করল।

  • সারাদেশে আনন্দ মিছিল বেরিয়েছিল
  • মিষ্টি বিতরণ, আতশবাজি ফোটানো হয়েছিল
  • সোশ্যাল মিডিয়া মেসির ছবিতে ভরে গিয়েছিল
  • বিদেশি মিডিয়ায় বাংলাদেশের উৎসবের খবর প্রকাশ পেয়েছিল
  • স্থানীয় বাজারে নীল-সাদা পণ্যের বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল

আর্জেন্টিনার খেলার ধরন বাংলাদেশের পছন্দ।

আর্জেন্টিনার ফুটবল সবসময় আবেগনির্ভর ও আক্রমণাত্মক। সুন্দর ড্রিবলিং, দলীয় কম্বিনেশন আর শেষ মুহূর্তে অবিশ্বাস্য গোল এই ধরনের ফুটবল বাংলাদেশের দর্শকদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। শুধু জেতাই নয়, কীভাবে জেতা হচ্ছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। আর আর্জেন্টিনা সবসময়ই দর্শকদের মনে আনন্দ দিয়ে জেতার চেষ্টা করেছে।

প্রশ্নোত্তর

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থন কখন থেকে শুরু হয়?

মূলত ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ থেকে। সেই বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার অসাধারণ পারফরম্যান্স বাংলাদেশের মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলে এবং সেই থেকেই ধীরে ধীরে আর্জেন্টিনার সমর্থক ভিত্তি তৈরি হতে থাকে।

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা বেশি জনপ্রিয় নাকি ব্রাজিল?

বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থক সংখ্যা ব্রাজিলের চেয়ে বেশি বলে ধারণা করা হয়। তবে উভয় দলেরই বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে এবং বিশ্বকাপের সময় এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে মজার প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়।

মেসি কি বাংলাদেশের সমর্থন সম্পর্কে জানেন?

হ্যাঁ, বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে মেসি দক্ষিণ এশিয়ায় আর্জেন্টিনার বিশাল সমর্থন সম্পর্কে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর বাংলাদেশের উৎসবের ভিডিও আন্তর্জাতিকভাবে ভাইরাল হয়েছিল