কুরবানির ঈদ মুসলমানদের জীবনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। প্রতি বছর জিলহজ মাসে এই মহান আমলটি পালিত হয়। কিন্তু অনেকের মনে একটি সাধারণ প্রশ্ন থেকে যায় কুরবানি ঈদের আগে চুল কাটা যাবে কি না। এই প্রশ্নটি শুধু সাধারণ মানুষের নয়, অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমানের মনেও ঘুরে বেড়ায়। ইসলামের আলোকে এই বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বুঝে নেওয়া প্রতিটি মুসলমানের জন্য জরুরি।
জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের বিশেষ মর্যাদা।
জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এই দশ দিনের আমলকে আল্লাহ তাআলা কুরআনে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। সূরা আল-ফজরে আল্লাহ “দশ রাত্রির” শপথ করেছেন, যা মুফাসিরিনদের মতে জিলহজের প্রথম দশ রাত্রিকে বোঝায়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এই দিনগুলোতে নেক আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়।
এই বিশেষ দিনগুলোতে কিছু নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে, যা কুরবানি করার ইচ্ছাপোষণকারী ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য। তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি হলো কুরবানি ঈদের আগে চুল কাটা যাবে কি না এবং নখ কাটার বিধান কী।
হাদিসের আলোকে মূল বিধান।
ইমাম মুসলিম রহিমাহুল্লাহ তাঁর সহিহ গ্রন্থে উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। সেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যে কেউ কুরবানি দেওয়ার ইচ্ছা করে, সে যেন জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে।”
সহিহ মুসলিম, কিতাবুল আযাহি, হাদিস নং ১৯৭৭। উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত।
এই হাদিসটি হলো মূল ভিত্তি, যার ওপর ভিত্তি করে আলেমগণ এই বিষয়ে মতামত দিয়েছেন।
আলেমদের মতভেদ এবং বিভিন্ন মাযহাবের অবস্থান।
এই বিষয়ে ইসলামী ফিকহের চারটি প্রধান মাযহাবের আলেমগণ ভিন্ন ভিন্ন মতামত দিয়েছেন। নিচের টেবিলে বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| মাযহাব | মতামত | হুকুমের ধরন | না মানলে |
|---|---|---|---|
| হানাফি | চুল ও নখ না কাটা উত্তম | মুস্তাহাব | গুনাহ নেই |
| শাফেয়ি | চুল ও নখ না কাটা সুন্নত | সুন্নত | সওয়াব মিস হবে |
| মালেকি | মাকরুহ নয়, বর্জন করা উত্তম | মুস্তাহাব | গুনাহ নেই |
| হাম্বলি | চুল ও নখ না কাটা আবশ্যক | ওয়াজিব | গুনাহ হবে |
আরো পড়ুন : কোরবানি কার জন্য জায়েজ? জানুন সম্পূর্ণ ইসলামিক নিয়ম 2026
হাম্বলি মাযহাবের মতে এটি ওয়াজিব এবং ইচ্ছাকৃতভাবে না মানলে গুনাহ হবে। তবে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী এটি মুস্তাহাব, অর্থাৎ না করলে গুনাহ নেই কিন্তু করলে সওয়াব পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশে অধিকাংশ মুসলমান হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন।
কুরবানি ঈদের আগে চুল কাটা যাবে কিনা?
সরাসরি বলতে গেলে, কুরবানি ঈদের আগে চুল কাটা যাবে কি না তার উত্তর হলো চুল না কাটাটাই উত্তম এবং এটি একটি ফজিলতপূর্ণ আমল। তবে কেউ কাটলে তা হারাম নয়। যারা কুরবানি দেওয়ার নিয়ত করেছেন, তাদের জন্য জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকে কুরবানির পশু জবাই করা পর্যন্ত চুল ও নখ না কাটা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আরো পড়ুন : মালয়েশিয়া কুরবানী ঈদ কবে ২০২৬ 100% নিশ্চিত সরকারি তারিখ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার এই বিধান শুধুমাত্র তাদের জন্য প্রযোজ্য যারা নিজে কুরবানি দেবেন বা যাদের পক্ষ থেকে কুরবানি দেওয়া হবে। পরিবারের অন্য সদস্যরা যদি কুরবানিদাতা না হন, তাহলে তাদের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য নয়।
কেন এই বিধান পালন করা উচিত?
ইসলামি স্কলারগণ এই বিধানের পেছনে বেশ কিছু হিকমত বা প্রজ্ঞার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, হাজিরা যেমন ইহরামের অবস্থায় চুল ও নখ কাটেন না, তেমনি কুরবানিদাতারাও একই ধরনের আধ্যাত্মিক অবস্থায় থাকার সুযোগ পান। এতে ইবাদতের একটি গভীর অনুভূতি তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, এটি মহান আল্লাহর নির্দেশ পালনে নিজেকে সমর্পিত রাখার একটি প্রতীকী প্রকাশ। পশুর শরীরের মতো নিজের শরীরের কিছু অংশও আল্লাহর জন্য ছেড়ে দেওয়ার মনোভাব এখানে প্রতিফলিত হয়।
আরো পড়ুন : ঈদুল আযহা সম্পর্কে কোরআনের আয়াত জানুন ৭টি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত ও অর্থ।
তৃতীয়ত, এটি কুরবানির প্রস্তুতির একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা মনে একটি বিশেষ সচেতনতা ও ইবাদতের আগ্রহ তৈরি করে।
ভুলে বা না জেনে কেটে ফেললে কী করবেন?
অনেক সময় মানুষ এই বিধানটি সম্পর্কে না জেনে বা ভুলে চুল বা নখ কেটে ফেলেন। এই অবস্থায় ঘাবড়ানোর কিছু নেই। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী এটি মুস্তাহাব হওয়ায় ভুলে করলে কোনো গুনাহ নেই। তবে যারা হাম্বলি মতানুযায়ী আমল করেন, তারা এ অবস্থায় তওবা করবেন এবং বাকি সময় আর কাটবেন না।
কুরবানি ঈদের আগে চুল কাটা যাবে কি না এই প্রশ্নে সবচেয়ে নিরাপদ এবং ফজিলতপূর্ণ অবস্থান হলো জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত চুল ও নখ থেকে বিরত থাকা।
কুরবানি দাতার পরিবারের ক্ষেত্রে বিধান।
একটি ঘরে যদি একজন কুরবানিদাতা থাকেন, তাহলে কি পুরো পরিবারকে এই বিধান মানতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর হলো না। এই বিধান শুধুমাত্র যিনি কুরবানি দিচ্ছেন বা যার নামে কুরবানি দেওয়া হচ্ছে তার জন্য। পরিবারের শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি বা যারা কুরবানিদাতা নন তাদের জন্য এই বিধান প্রযোজ্য নয়।
তবে স্বামী যদি কুরবানিদাতা হন এবং স্ত্রীও নিজেকে এই আমলে যুক্ত রাখতে চান, তাহলে তিনিও স্বেচ্ছায় এই আমল পালন করতে পারেন এবং এতে সওয়াব পাবেন।
আধুনিক জীবনে এই বিধান পালনের কার্যকর উপায়।
আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেকের মনে হয় এই আমলটি পালন করা কঠিন। কিন্তু একটু পরিকল্পনা করলেই এটি সহজ হয়ে যায়। জিলহজের চাঁদ ওঠার আগেই চুল ও নখ পরিষ্কার করে নেওয়া একটি কার্যকর পদক্ষেপ। এরপর কুরবানি সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা তেমন কঠিন নয়।
কর্মজীবী মানুষের জন্য পেশাগত প্রয়োজনে যদি চুল কাটা জরুরি হয়ে পড়ে, তাহলে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী তিনি কাটতে পারবেন কারণ এটি ওয়াজিব নয়, মুস্তাহাব। তবে এড়াতে পারলেই উত্তম।
আরো পড়ুন : ঈদুল আযহা 2026 ছুটি এ টানা ৭ দিন! কবে থেকে শুরু জানেন কি?
কুরবানি ঈদের আগে চুল কাটা যাবে কি না এই বিষয়টি যখন স্পষ্ট হয়, তখন একজন মুমিনের উচিত সাধ্যমতো এই আমলটি পালন করার চেষ্টা করা। কারণ ইসলামের প্রতিটি বিধানের মধ্যেই মানুষের কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
কোরবানির আগে চুল দাড়ি কাটার নিয়ম
যিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি করা পর্যন্ত চুল, দাড়ি ও নখ না কাটা মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোরবানি করতে চায়, সে যেন যিলহজের চাঁদ উঠার পর থেকে চুল ও নখ না কাটে।” (সহিহ মুসলিম)
এই বিধান মূলত যে ব্যক্তি নিজে কোরবানি দেবেন তার জন্য প্রযোজ্য। পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য আলাদা কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সময়কাল হলো ১ যিলহজ থেকে কোরবানি সম্পন্ন করা পর্যন্ত।
বিধানটি ওয়াজিব না মুস্তাহাব তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। অধিকাংশ আলেমের মতে এটি মুস্তাহাব, অর্থাৎ করলে সওয়াব পাওয়া যায় কিন্তু না করলে গুনাহ নেই। তবে ইমাম আহমদ (রহ.)-এর মতে এটি ওয়াজিব। ভুলে বা না জেনে কেটে ফেললে কোনো কাফফারা নেই, শুধু তওবা করলেই যথেষ্ট। কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে চুল, দাড়ি ও নখ কাটা যাবে।
প্রশ্নোত্তর
কুরবানি ঈদের আগে চুল কাটা যাবে কি না?
জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত চুল না কাটা উত্তম। হানাফি মতে এটি মুস্তাহাব, হাম্বলি মতে ওয়াজিব। তবে না মানলে কুরবানি বাতিল হয় না।
এই বিধান কার জন্য প্রযোজ্য?
এই বিধান শুধুমাত্র যিনি কুরবানি দেবেন তার জন্য প্রযোজ্য। পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক নয়।
জিলহজের কত তারিখ থেকে চুল না কাটার বিধান শুরু হয়?
জিলহজ মাসের নতুন চাঁদ দেখার পর অর্থাৎ জিলহজের ১ তারিখ থেকে এই বিধান শুরু হয় এবং কুরবানি সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত চলে।
ভুলে চুল কেটে ফেললে কুরবানি হবে কি?
হ্যাঁ, কুরবানি হবে। ভুলে চুল বা নখ কেটে ফেললে কুরবানির কোনো ক্ষতি হয় না। তবে হাম্বলি মতে তওবা করতে হবে এবং পরে আর কাটবেন না।
নখ কাটার বিধান কি চুল কাটার মতোই?
হ্যাঁ, হাদিসে চুল ও নখ উভয়ের কথাই একসঙ্গে বলা হয়েছে। তাই কুরবানি ঈদের আগে চুল কাটা যাবে কি না একই বিধান নখের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
যদি কেউ কুরবানি না দেন, তাহলে কি তার জন্যও এই বিধান প্রযোজ্য?
না, যে ব্যক্তি কুরবানি দেবেন না তার জন্য এই বিধান প্রযোজ্য নয়। এটি কেবল কুরবানিদাতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
চার মাযহাবের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে কঠোর মত দিয়েছে?
হাম্বলি মাযহাব সবচেয়ে কঠোর মত দিয়েছে। তারা মনে করেন এটি ওয়াজিব এবং ইচ্ছাকৃতভাবে না মানলে গুনাহ হবে।
কুরবানির পর চুল ও নখ কাটা যাবে কি?
হ্যাঁ, কুরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর চুল ও নখ কাটার কোনো বাধা নেই। বরং কুরবানির দিন গোসল করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়া সুন্নত।
এই আমল কি হজের ইহরামের মতো?
কিছুটা মিল আছে। ইহরামে থাকাকালীন হাজিরা চুল ও নখ কাটেন না। কুরবানিদাতারা একই ধরনের আধ্যাত্মিক সংযম পালন করেন, যদিও এটি ইহরামের মতো বাধ্যতামূলক নয়।
এই বিধান পালন না করলে কি গুনাহ হবে?
হানাফি ও মালেকি মতে না, কারণ এটি মুস্তাহাব। তবে হাম্বলি মতে ইচ্ছাকৃতভাবে না মানলে গুনাহ হবে। বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষ হানাফি মাযহাব মানেন।
শেষ কথা
কুরবানি ইসলামের একটি মহান ইবাদত। এই ইবাদতকে ঘিরে যেসব আমল রয়েছে তার প্রতিটিই আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ। কুরবানি ঈদের আগে চুল কাটা যাবে কি না এই প্রশ্নের উত্তর জেনে এবং সঠিক আমল পালন করে প্রতিটি মুসলমান এই জিলহজের মহান সুযোগকে পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক আমল করার তওফিক দান করুন। আমিন।
👉🙏লেখার মধ্যে ভাষা জনিত কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে অবশ্যই ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
✅আজ এ পর্যন্তই ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন 🤔
1 thought on “90% মানুষ জানে না! কুরবানি ঈদের আগে চুল কাটা যাবে কি না?”