فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“সুতরাং তোমার প্রতিপালকের জন্য নামায পড়ো এবং কোরবানি করো।”
 (সূরা আল-কাউসার: ২)

কোরবানির ইতিহাস ও তাৎপর্য।

কোরবানির ইতিহাস শুরু হয়েছিল হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলার নির্দেশে তিনি তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। সেই অসীম আনুগত্যের স্মরণে মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর পশু কোরবানি করে থাকেন। কোরবানি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত সমর্পণের প্রতীক।

আরো পড়ুন : মালয়েশিয়া কুরবানী ঈদ কবে ২০২৬ 100% নিশ্চিত সরকারি তারিখ।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কোরবানির দিনে মানুষের কোনো আমলই আল্লাহর কাছে রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে অধিক প্রিয় নয়। কিয়ামতের দিন কোরবানির পশু তার শিং, পশম ও খুর নিয়ে আসবে এবং কোরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে মকবুল হয়ে যায়।” (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)।

কোরবানি কার জন্য জায়েজ মূল শর্তাবলি।

কোরবানি কার জন্য জায়েজ তা বোঝার জন্য আমাদের প্রথমে মূল চারটি শর্ত জানতে হবে। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নিম্নলিখিত শর্ত পূরণ হলেই কোরবানি ওয়াজিব হয়।

মুসলিম হওয়া

কোরবানি শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য। অমুসলিমের জন্য এটি প্রযোজ্য নয়।

স্বাধীন ও মুকিম হওয়া

মুসাফির নন এমন ব্যক্তির উপর কোরবানি ওয়াজিব। মুকিম মানে নিজ এলাকায় অবস্থানকারী।

নিসাব পরিমাণ সম্পদ

৫২.৫ তোলা রূপা বা সমমূল্যের সম্পদ থাকলে কোরবানি ওয়াজিব হয়।

আরো পড়ুন : ঈদুল আযহা সম্পর্কে কোরআনের আয়াত জানুন ৭টি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত ও অর্থ।

নির্দিষ্ট সময়

১০ই জিলহজ ফজর থেকে ১২ই জিলহজ সূর্যাস্তের মধ্যে কোরবানি করতে হবে।

নিসাব পরিমাণ সম্পদ কী?

কোরবানি কার জন্য জায়েজ তার একটি কেন্দ্রীয় মানদণ্ড হলো নিসাব। নিসাব হলো সেই ন্যূনতম পরিমাণ সম্পদ যার উপর ভিত্তি করে কোরবানি ওয়াজিব হয়। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী যার কাছে ৫২.৫ তোলা রূপার সমমূল্যের সম্পদ আছে, তার উপর কোরবানি ওয়াজিব। এই সম্পদের মধ্যে নগদ অর্থ, সোনা-রূপা, ব্যবসায়িক পণ্য ও অতিরিক্ত সম্পদ অন্তর্ভুক্ত। তবে জাকাতের নিসাবের সাথে পার্থক্য হলো, কোরবানির নিসাবের জন্য এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়।

আরো পড়ুন : ঈদুল আযহা 2026 ছুটি এ টানা ৭ দিন! কবে থেকে শুরু জানেন কি?

যদি কোরবানির ঈদের দিন সকালে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলেই কোরবানি ওয়াজিব হয়ে যায়। এমনকি যদি কেউ ঋণ করেও নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তাহলেও তার উপর কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার বিষয়ে আলেমদের মত রয়েছে।

বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে কোরবানির হুকুম।

ব্যক্তির ধরন কোরবানির হুকুম কারণ
নিসাব পরিমাণ সম্পদওয়ালা মুকিম মুসলিম ওয়াজিব সকল শর্ত পূর্ণ
মুসাফির (সফররত ব্যক্তি) ওয়াজিব নয়, নফল হিসেবে জায়েজ মুকিম না হওয়া
দরিদ্র ব্যক্তি (নিসাব নেই) ওয়াজিব নয়, নফল হিসেবে জায়েজ নিসাব পূর্ণ নয়
অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ওয়াজিব নয় বালেগ নয়
পাগল বা মানসিক অসুস্থ ওয়াজিব নয় আকল নেই
অমুসলিম জায়েজ নয় ইসলামের বাইরে
সামর্থ্যবান মহিলা ওয়াজিব সকল শর্ত পূর্ণ

মহিলাদের কোরবানি।

কোরবানি কার জন্য জায়েজ এই আলোচনায় মহিলাদের প্রসঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, যদি কোনো মহিলার নিজস্ব নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে তার উপরও কোরবানি ওয়াজিব। স্বামীর কোরবানি দেওয়া স্ত্রীর পক্ষে যথেষ্ট নয় যদি স্ত্রী নিজেই নিসাবের মালিক হন। তবে পরিবারের প্রধান পুরুষ যদি পরিবারের পক্ষ থেকে কোরবানি দেন, সেটি ভিন্ন বিষয়।

একটি পশুতে কয়জন কোরবানি দিতে পারবেন?

ছোট পশু যেমন ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদিতে একজনের পক্ষ থেকে কোরবানি দিতে হয়। কিন্তু গরু, মহিষ বা উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন। তবে শর্ত হলো প্রতিটি শরিকের নিয়ত অবশ্যই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। যদি কোনো অংশীদার শুধু গোশত খাওয়ার জন্য অংশ নেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি তাঁর উদ্দেশ্য না হয়, তাহলে পুরো কোরবানিই নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আরো পড়ুন : কোরবানি ঈদের শুভেচ্ছা স্ট্যাটাস যা পড়লে চোখে জল আসবে 2026 সালের সেরা স্ট্যাটাস।

পশুর ধরন সর্বনিম্ন বয়স শরিকের সংখ্যা বিশেষ শর্ত
ছাগল / ভেড়া / দুম্বা ১ বছর ১ জন দুম্বা ৬ মাসেও জায়েজ
গরু / মহিষ ২ বছর সর্বোচ্চ ৭ জন সকলের নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়া
উট ৫ বছর সর্বোচ্চ ৭ জন সুস্থ ও নিখুঁত হওয়া

মৃত ব্যক্তির পক্ষে কোরবানি।

মৃত ব্যক্তির পক্ষে কোরবানি করা জায়েজ। তবে এটি নফল কোরবানি হিসেবে গণ্য হয়। যদি কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর আগে কোরবানির ওসিয়ত করে যান, তাহলে তার পক্ষ থেকে কোরবানি করা ওয়ারিসদের উপর আবশ্যক হয়ে যায়। ওসিয়ত না থাকলেও সওয়াব পাঠানোর উদ্দেশ্যে মৃত বাবা-মা বা স্বজনদের পক্ষে কোরবানি দেওয়া উত্তম কাজ।

কোরবানি না দিলে কী হয়?

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।” (ইবনে মাজাহ)। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে কোরবানি ওয়াজিব, ফরজ নয়। যে ব্যক্তির উপর কোরবানি ওয়াজিব ছিল কিন্তু সে করেনি, তার কর্তব্য হলো তওবা করা এবং কোরবানির পশুর মূল্য সদকাহ করে দেওয়া।

কোরবানির গোশত বিতরণের নিয়ম।

কোরবানির গোশত তিন ভাগ করা মুস্তাহাব। এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনদের জন্য এবং এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য। তবে সম্পূর্ণ গোশত নিজে রেখে দেওয়াও জায়েজ। কোরবানির চামড়া বিক্রি করলে সেই অর্থ গরিবদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে নিজে ব্যবহার করা যাবে না।